হেলথ ডে, অটিজম
অটিজম শিশুদের জন্য করণীয়   বাসস
বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস অটিজম হচ্ছে শিশুদের স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা সম্পর্কিত একটি রোগ। যে রোগে একটি শিশুর সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে অসুবিধা হয়। চারপাশের পরিবেশ ও ব্যক্তির সাথে স্বাভাবিক কথাবার্তা ইশারা-ইঙ্গিত ইত্যাদির মাধ্যমেও যোগাযোগের সমস্যা হয় এবং আচরণেরও পরিবর্তন হয়। মোটকথা যে সমস্যা একটি শিশুকে শারীরিক এবং মানসিক দিক থেকে অপূর্ণতায় পর্যবসিত করে তাকে অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার বলে। অটিজমকে অনেকে মানসিক রোগ মনে করলেও এটি প্রধানত স্নায়ুবিক বিকাশজনিত সমস্যা। যে সমস্যার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তি আর দশজন মানুষের সাথে স্বাভাবিক যোগাযোগ ও সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে ব্যর্থ হয়। অটিজমের কারণ অটিজমের সুনির্দিষ্ট কারণ এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে কিছু কিছু বিষয়কে অটিজমের কারণ হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে, বংশে কারও অটিজমের সমস্যা থাকা, গর্ভাবস্থায় অধিক দুশ্চিন্তা করা, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, অতিমাত্রায় ওষুধ সেবন, মায়ের ধূমপান ও মদ্যপানসহ গর্ভকালীন সংক্রমণ যেমন: মাম্পস, রুবেলা, মিসেলস ইত্যাদি হওয়া। এছাড়াও গর্ভাবস্থায় মায়ের সাথে পরিবারের সম্পর্কের ঘাটতি থাকা, বেশি বয়সে বাচ্চা নেওয়া, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা, দুশ্চিন্তা, বিষন্নতা, মৃগীরোগ, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (ঙঈউ), মনোযোগে ঘাটতি, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার। সেইসাথে কম ওজনে শিশুর জন্ম হওয়া, গর্ভাবস্থায় বিষাক্ত সিসাযুক্ত বাতাসে শ্বাস প্রশ্বাস নেয়া, প্রসবকালীন কোনো জটিলতা, মা ও শিশুর অপুষ্টিজনিত সমস্যা ইত্যাদি কারণেও অটিজম হতে পারে। অটিজমের লক্ষণ অটিজম আক্রান্ত শিশুর প্রধান সমস্যা হলো ভাষা। এই রোগে আক্রান্তদের শুরুতেই ভাষা আয়ত্ত করতে সমস্যা হয়। বারো মাস বয়সেও শিশু ‘মা-মা’, ‘বা-বা’, ‘বু-বু’ ‘চা-চা’ ‘দা-দা ইত্যাদি উচ্চারণ করতে পারে না। অনেক শিশু অল্প মাত্রায় হলেও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা দেখা দেওয়া, সেই সাথে কারো কারো মাঝে শারীরিক বৃদ্ধির ঘাটতি দেখা দেয়া। শিশুর দুই বছরের মধ্যে অর্থপূর্ণ দুটি শব্দ দিয়ে কথা বলতে না পারা। কিছু কিছু শিশুর ক্ষেত্রে কথা বলতে জড়তা সৃষ্টি হওয়া। কোনো কোনো শিশু কথা বলা শুরু করলেও পরে আস্তে আস্তে ভুলে যাওয়া। শিশু চোখে চোখ রাখতে না পারা। নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া। হঠাৎ করে উত্তেজিত হয়ে উঠা। শিশুর মানসিক অস্থিরতা বেশি থাকা। সেই সাথে বিষন্নতা, উদ্বিগ্নতা ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়া। অটিজমে রোগে আক্রান্ত শিশুরা দেখা, শোনা, শব্দ, গন্ধ, স্বাদ, আলো বা স্পর্শের প্রতি অনেক সংবেদনশীল বা প্রতিক্রিয়াহীন হয়। অন্যান্য সমবয়সী শিশুর সাথে মিশতে সমস্যা হওয়া এবং বড়দের সাথেও মিশতে না পারা, কারো আদর নিতে বা দিতে না পারা। এমনকি কারো প্রতি আগ্রহ না থাকা এবং পরিবেশ অনুযায়ী মুখভঙ্গি পরিবর্তন করতে না পারা। সব সময় একা একা থাকার চেষ্টা করা। ঘরের একটা নির্দিষ্ট স্থানে নিজের মত থাকার চেষ্টা করা। আক্রান্ত শিশু পছন্দের বা আনন্দের কোনো কিছুকে অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করতে না পারা। অন্যের থেকে শোনা কথা বার বার বলতে থাকা এবং বার বার একই আচরণ করা। একটি নিজস্ব রুটিন মেনে চলতে পছন্দ করা, রুটিনের কোনো পরিবর্তন সহ্য করতে না পারা। নিজেকে আঘাত করার প্রবণতা এবং পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে না পারা। আরও যেসব সমস্যা থাকতে পারে সেগুলো হলোÑ খিঁচুনি (মৃগী), বুদ্ধির ঘাটতি, অতিচঞ্চলতা বা হাইপার অ্যাক্টিভিটি, হাতের কাজ করতে না পারার জটিলতা, দাঁতের সমস্যা, হজমের সমস্যা, খাবার চিবিয়ে খেতে না পারা ইত্যাদি সমস্যা থাকতে পারে। চিকিৎসা বাংলাদেশে অটিজম সম্পর্কে ধারণা খুবই কম। ফলে অনেকেই শুরুতে এই রোগ নির্ণয় করতে পারেন না। যার ফলে চিকিৎসা করতে বিলম্ব হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, অটিজম কোনো রোগ নয়, এটি একটি মস্তিষ্কের পরিপূর্ণ বিকাশজনিত সমস্যা। যা একটি শিশুকে সামাজিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরি করতে বাধা সৃষ্টি করে। কিন্তু দ্রুত শনাক্ত করে শিশুর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নির্দিষ্ট চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে পারলে এই শিশুরাও অন্য শিশুদের মত উন্নতি করতে পারে। সবার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ এবং উপদেশ নিয়ে শিশুর চিকিৎসা শুরু করতে হবে। এরপর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরিচর্যা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ আর প্রয়োজনে বিশেষ কিছু সমস্যার ওষুধ সেবন করাতে হয়। অটিজম আছে এমন শিশুর আচরণজনিত সমস্যা, অতিচঞ্চলতা, অস্থিরতা, নিজেকে আঘাত করার প্রবণতা, খিঁচুনি বা খিটখিটে মেজাজ ইত্যাদির জন্য পৃথিবীর সব উন্নত দেশেই সীমিত আকারে ওষুধের প্রয়োগ রয়েছে। এই ওষুধ তাকে প্রশিক্ষণের উপযোগী করে তুলবে এবং সহযোগী সমস্যাগুলোকে কমাতে সাহায্য করবে। প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা অটিজম সম্পর্কে আমাদের দেশে আলোচনা হলেও পর্যাপ্ত পরিমাণ সামাজিক সচেতনতা এখনো সৃষ্টি হয়নি। বিশেষ করে আক্রান্ত শিশুর পরিবার পরিজনেরাই কখনো এ জাতীয় শিশুকে মেনে নেয় না। ফলে শিশুটি জন্মের পর থেকেই অবহেলিত থাকে। যদিও বিগত কয়েক বছরে সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে সচেতনতা বহুগুণ বেড়েছে। এতোকিছুর পরও পারিবারিক ও সামাজিকভাবে যতটুকু সচেতনতার প্রয়োজন তা পরিপূর্ণভাবে হচ্ছে না। তাই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আরও বেশি বেশি সচেতনতামূলক কর্মপরিকল্পনা নেওয়া উচিত। কেননা এই রোগে আক্রান্তদের এখনো লোকে পাগল মনে করে বা মানসিক প্রতিবন্ধীদের সাথে অটিজমকে এক করে ফেলে। ফলে এ রোগে আক্রান্তরা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অবহেলিতই থেকে যায়। তাই অটিজম সম্পর্কে পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে ব্যাপক সচেতনতা ও সহায়তা বৃদ্ধি হওয়া খুবই প্রয়োজন।