২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস, হেপাটাইটিস হলো একটি ভাইরাসজনিত রোগ; যা মূলত লিভারের সংক্রমণ ও প্রদাহের ফলে হয়ে থাকে। পরজীবী হেপাটাইটিস প্রোটোজোয়া এবং ম্যালেরিয়ার জীবাণুর (প্লাজমোডিয়াম) প্রজাতি লিভারে প্রদাহ ঘটায়। সারাবিশ্বে হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি ও ই সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা; রোগ নির্ণয়; প্রতিকার ও প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রতি বছর ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালন করা হয়।
হেপাটাইটিস দিবস পালনের পটভূমি
১৯৬৭ সালের ড. বারুচ স্যামুয়েল ব্লুমবার্গ প্রথম হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আবিষ্কার করেন। শুধু তাই নয়, তিনি প্রথম হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন তৈরি করেন যার জন্য তিনি নোবেল পুরস্কারে পুরস্কৃত হন। ২৮ জুলাই এই মহান ব্যক্তিত্বের জন্মদিন আর তাই প্রতি বছর ব্লুমবার্গের অবদানকে স্মরণ করার জন্যই পালন করা হয় বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। ২০০৪ সালে প্রথমবারের মতো World Hepatitis Alliance এই দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়। তখন তারিখটি ছিল ১৯ মে। পরবর্তীতে WHO-এর সমর্থনে ২৮ জুলাইকে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়।
দিবসটি পালনের লক্ষ্য - উদ্দেশ্য
হেপাটাইটিসের বিভিন্ন রূপ এবং কীভাবে এটি সংক্রামিত হয় সে সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। হেপাটাইটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও সেবা নিশ্চিত করা। হেপাটাইটিস-বি টিকার আওতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে একীভূতকরণ। হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী উদ্যোগ গ্রহণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০১৬ সালে ঘোষণা করে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিসকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে নির্মূল করা হবে।
প্রতিবছর এই রোগে বিশ্বব্যাপী ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এ রোগটি শুধু পূর্ব এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকায় বেশি দেখা যায়।
হেপাটাইটিসের ৫ টি ধরণ রয়েছে। যথা: এ, বি, সি, ডি ও ই। এর মধ্যে বি ও সি মারাত্মক রূপ নেয়। যা লিভার সিরোসিস ও ক্যান্সারের মতো মারাত্মক আকার ধারণ করে। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা করা না হলে সমস্যা আরো গুরুতর হয়ে লিভার সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
লক্ষণ
তীব্র বা একুয়েট (স্বল্পমেয়াদি) হেপাটাইটিসের প্রায়শই কোনো উপসর্গ থাকে না। যদি উপসর্গ দেখা যায় সেগুলো হলো:
জন্ডিস, চোখ, শরীর বা প্রস্রাব হলুদ হয়ে যাওয়া। হঠাৎ বমি বমি ভাব, বমি হওয়া ও ক্লান্ত বোধ করা। খাবারে অরুচি, অনীহা কিংবা তীব্র দুর্বলতা। শরীরে চুলকানি, জ্বর জ্বর ভাব এমনকি পায়ে বা পেটে পানি চলে আসা।
হেপাটাইটিসের প্রতিটি ধরনের জন্য প্রতিকার ব্যবস্থা ভিন্ন ভিন্ন
🔸 হেপাটাইটিস এ এবং ই সাধারণত অল্প সময়েই সেরে যায় এবং বিশেষ কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
🔸 হেপাটাইটিস বি, সি ও ডি এর চিকিৎসায় এন্টিভাইরাল ঔষধ ব্যবহার করা হয়।
🔸 হেপাটাইটিসের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
🔸 বিশ্রাম ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে হবে।
হেপাটাইটিস ভাইরাস প্রতিরোধে করণীয়
🔸 যথাসময়ে টিকা গ্রহণ, বিশেষত জন্মের পর নবজাতককে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের টিকা প্রদান।
🔸 রক্ত পরিসঞ্চালনের পূর্বে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস নিশ্চিত নিরীক্ষাকরণ।
🔸 চুল কাটার পরে এবং শেভ করার সময় একই ব্লেড বার বার ব্যবহার না করা।
🔸 অন্যের ব্রাশ, রেজার, নেইল কাটার ব্যবহার থেকে বিরত থাকা।
🔸 জনসাধারণের মধ্যে হেপাটাইটিস সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা করা।
ভাইরাল হেপাটাইটিসের ধরণ পাঁচটি
লিভারের ভাইরাল সংক্রমণকে হেপাটাইটিস হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয় হেপাটাইটিস একটি, B, C, D এবং E প্রতিটি ধরণের ভাইরাল ট্রান্সমিটেড হেপাটাইটিসের জন্য দায়ী ভাইরাস অনুসারে। যদিও হেপাটাইটিস এ একটি স্বল্পমেয়াদী রোগ এবং সর্বদা তীব্র হয়, হেপাটাইটিস বি, C, এবং D সম্ভবত চলমান এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। হেপাটাইটিস ই এটি সাধারণত গুরুতর এবং বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হতে পারে।
- হেপাটাইটিস একটি: হেপাটাইটিস A ভাইরাস (HAV) এর সংক্রমণের কারণে, এই ধরনের হেপাটাইটিস সাধারণত হেপাটাইটিস A সংক্রামিত ব্যক্তির মল দ্বারা দূষিত পানি বা খাবার খাওয়ার মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়।
- হেপাটাইটিস বি: হেপাটাইটিস বি ভাইরাস (এইচবিভি) দ্বারা সৃষ্ট, হেপাটাইটিস বি সংক্রামক শরীরের তরল যেমন বীর্য, যোনি নিঃসরণ বা এইচবিভিযুক্ত রক্তের সংস্পর্শের মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়। সংক্রামিত ব্যক্তির সাথে রেজার শেয়ার করা, ইনজেকশন ড্রাগ ব্যবহার বা সংক্রামিত সঙ্গীর সাথে যৌনতা হেপাটাইটিস বি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
- হেপাটাইটিস সি: হেপাটাইটিস সি ভাইরাস (এইচসিভি) দ্বারা সৃষ্ট, হেপাটাইটিস সি, একটি সাধারণ রক্তবাহিত সংক্রমণ, সংক্রামিত ব্যক্তির তরলের সাথে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে, সাধারণত যৌন যোগাযোগ এবং ইনজেকশন ড্রাগ ব্যবহারের মাধ্যমে সংক্রামিত হয়।
- হেপাটাইটিস ডি: হেপাটাইটিস ডি ভাইরাস (HDV) দ্বারা সৃষ্ট, হেপাটাইটিস ডি (বা ডেল্টা হেপাটাইটিস) একটি গুরুতর লিভার রোগ যা সংক্রামিত রক্তের সাথে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। এটি হেপাটাইটিসের একটি বিরল রূপ যা শুধুমাত্র হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের সাথে ঘটে। এইচডিভি হেপাটাইটিস বি-এর উপস্থিতি ছাড়া সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে না।
- হেপাটাইটিস ই: হেপাটাইটিস ই ভাইরাস (এইচইভি) দ্বারা সৃষ্ট, হেপাটাইটিস ই, একটি জলবাহিত রোগ, প্রধানত দুর্বল স্যানিটেশন সহ এলাকায় পাওয়া যায়। এটি সাধারণত মল পদার্থ থেকে হয় যা জল সরবরাহকে দূষিত করে।
হেপাটাইটিস: চলুন সহজভাবে বুঝি
হেপাটাইটিস প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের পথে যেসব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক বাধা রয়েছে, তা দূর করতে হবে। হেপাটাইটিসের ভয়াবহতা, প্রতিরোধের উপায়, পরীক্ষা ও চিকিৎসা সম্পর্কে সবার জানা জরুরি। এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ, যদি সঠিক সময়ে পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়।
হেপাটাইটিস কী
আগেই বলা হয়েছে হেপাটাইটিস হলো লিভারের প্রদাহ, যা সাধারণত ভাইরাসের কারণে হয়। এর মধ্যে রয়েছে হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই ভাইরাস। এসব ভাইরাস তাৎক্ষণিক (অ্যাকিউট) ও দীর্ঘস্থায়ী (ক্রনিক) লিভার রোগের কারণ হতে পারে, যার পরিণতিতে লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যানসার ও শেষ পর্যন্ত লিভার ফেইলিউর হতে পারে। বর্তমানে হেপাটাইটিস বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী সংক্রামক ভাইরাস। প্রতিবছর ২২ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে আক্রান্ত হন এবং ১০ লাখের মানুষ হেপাটাইটিসজনিত জটিলতায় মারা যান।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
• হেপাটাইটিস এ এবং ই ভাইরাস দূষিত খাদ্য ও পানি থেকে ছড়ায়। এগুলো তাৎক্ষণিক লিভার সংক্রমণের কারণ হতে পারে। এমনকি ফালমিন্যান্ট হেপাটাইটিস হয়ে লিভার ফেইলিউরও হতে পারে।
• বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং হেপাটাইটিস সি-তে প্রায় শূন্য দশমিক ৬৬ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত।
• অকাল্ট (লুকায়িত) হেপাটাইটিস বি একটি বড় উদ্বেগ, যেখানে ব্যক্তি হেপাটাইটিস বি ভাইরাস বহন করে কিন্তু এইচবিএসএজি পরীক্ষায় ধরা পড়ে না, তা থেকে নীরবে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসার হতে পারে।
• দেশে ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাসে আক্রান্ত।
• প্রতিবছর ২০ হাজারের বেশি মানুষ হেপাটাইটিসের কারণে মারা যান।
• লিভার ক্যানসার বাংলাদেশে ক্যানসারে মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ। হেপাটাইটিস বি এবং সি লিভার ক্যানসারের মূল কারণ।
প্রতিরোধের উপায়
হেপাটাইটিস এ এবং ই প্রতিরোধের উপায়
• নিরাপদ পানি ও খাদ্য নিশ্চিত করা।
• নিরাপদ স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা।
• হেপাটাইটিস এ ভ্যাকসিন গ্রহণ করা।
• গর্ভবতী নারীদের হেপাটাইটিস ই বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ, তাই তাঁদের জন্য বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
হেপাটাইটিস বি এবং সি প্রতিরোধ
ভাইরাস দুটি সংক্রামিত রক্ত ও শরীরের তরলের মাধ্যমে ছড়ায়।
প্রতিরোধে যা করতে হবে—
• রক্ত সঞ্চালনের আগে হেপাটাইটিস বি, সি এবং হেপাটাইটিস বি কোর অ্যান্টিবডি (অ্যান্টি-এইচবিসি টোটাল) পরীক্ষা করা।
• একই সুচ ও সিরিঞ্জ পুনর্ব্যবহার নিষিদ্ধ।
• ব্যক্তিগত জিনিস (দাঁতের ব্রাশ, রেজর) অন্যের সঙ্গে ব্যবহার না করা।
• সেলুন, ডেন্টাল ক্লিনিক, অপারেশন, ট্যাটু বা কানের ফুটো করার সময় স্টেরিলাইজড সরঞ্জামের ব্যবহার।
• নিরাপদ যৌন আচরণ।
• আক্রান্ত ব্যক্তি যেন রক্ত বা অঙ্গ দান না করেন।
নিয়ন্ত্রণের কৌশল
• সর্বজনীন পরীক্ষা ও ভ্যাকসিনেশন।
• পরিবারের কোনো সদস্যের হেপাটাইটিস বি এবং সি নির্ণীত হলে পরিবারের অন্য সদস্যদের এই দুই ভাইরাসের পরীক্ষা করা এবং প্রতিরোধে হেপাটাইটিস বি টিকা দেওয়া।
• গর্ভকালীন হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক।
• নবজাতকের জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভ্যাকসিন ও প্রয়োজনে ইমিউনোগ্লোবিউলিন (এইচবিআইজি) প্রদান।
• চিকিৎসাব্যবস্থায় নিরাপদ চর্চা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ।
• হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাসের ওষুধের মূল্য সহজলভ্য করা।
• চাকরি, শিক্ষা ও সামাজিক পরিসরে কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করা।
• বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা ও তথ্য প্রচার।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণ
• দেশের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ গ্রামে বসবাস করেন। গ্রামাঞ্চলে সচেতনতা ও চিকিৎসাসেবার ঘাটতি রয়েছে।
• ৬২ শতাংশ গর্ভবতী নারী গ্রামে, যাঁদের কাছে পরীক্ষা ও ভ্যাকসিনেশন এখনো পৌঁছায়নি।
• কুসংস্কার, ভুল ধারণা ও পরিষেবার অভাবে তাঁরা চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন।
• স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ। যাতে গ্রামীণ জনগণ হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও চিকিৎসার আওতায় আসতে পারেন।
বাংলাদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্যে
• সব নবজাতককে বার্থডোজের আওতায় আনা।
• সরকারি, বেসরকারি সংস্থা, স্বাস্থ্যকর্মী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
• সচেতনতা, স্ক্রিনিং, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা—সবকিছু সহজলভ্য করতে হবে, বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য।
• জাতীয় ভাইরাল হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে সরকারিভাবে জাতীয় নীতিমালা ও কর্মসূচি গ্রহণ।
আসুন হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে হেপাটাইটিসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ি। একটি হেপাটাইটিসমুক্ত বাংলাদেশের প্রত্যাশায়।