ফাইল ছবি

“হঠাৎ পেটের ওপরের ডান দিকে তীব্র ব্যথা শুরু হলো। ভেবেছিলাম হয়তো গ্যাসের সমস্যা। কিন্তু ওষুধ খাওয়ার পরও ব্যথা কমল না। পরীক্ষা করানোর পর জানা গেল, পিত্তথলিতে পাথর হয়েছে।” এ ধরনের অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়ে থাকে।

পিত্তথলির পাথর বা Gallstone পরিপাকতন্ত্রের একটি পরিচিত সমস্যা। অনেকের পিত্তথলিতে পাথর থাকলেও বছরের পর বছর কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। আবার কারও ক্ষেত্রে পাথর পিত্তনালিতে বাধা সৃষ্টি করে তীব্র ব্যথা, পিত্তথলির প্রদাহ, জন্ডিস বা অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে।

সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।


১. পিত্তথলি কী এবং এর কাজ কী?

পিত্তথলি (Gallbladder) হলো যকৃতের নিচে অবস্থিত ছোট, থলির মতো একটি অঙ্গ। এর প্রধান কাজ হলো যকৃত থেকে তৈরি পিত্তরস (bile) জমিয়ে রাখা ও প্রয়োজনের সময় ক্ষুদ্রান্ত্রে ছেড়ে দেওয়া।

পিত্তরস বিশেষ করে খাবারের চর্বি হজমে সহায়তা করে।

পিত্তথলি শরীরের জন্য অপরিহার্য অঙ্গ নয়। পিত্তথলি অপসারণের পরও যকৃত পিত্তরস তৈরি করতে থাকে এবং তা সরাসরি ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবাহিত হয়। ফলে অধিকাংশ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।


২. পিত্তথলিতে পাথর কীভাবে তৈরি হয়?

পিত্তরসে প্রধানত কোলেস্টেরল, পিত্তলবণ ও বিলিরুবিনসহ বিভিন্ন উপাদান থাকে।

এই উপাদানগুলোর ভারসাম্য পরিবর্তিত হলে পিত্তরসে ছোট ছোট স্ফটিক তৈরি হতে পারে। ধীরে ধীরে এসব স্ফটিক জমে বড় হয়ে পাথরে পরিণত হয়।

পিত্তথলিতে পাথর তৈরির অন্যতম কারণ হলো—

  • পিত্তরসে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল থাকা
  • বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া
  • পিত্তথলি পর্যাপ্তভাবে বা নিয়মিত খালি না হওয়া
  • কিছু ক্ষেত্রে পিত্তনালির সংক্রমণ বা অন্যান্য রোগ

তবে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঠিক কেন পাথর তৈরি হয়েছে, তা সবসময় একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।


৩. পিত্তথলির পাথর কত ধরনের?

পিত্তথলির পাথরকে সাধারণভাবে প্রধানত দুই ধরনের হিসেবে বিবেচনা করা হয়—

১. কোলেস্টেরল পাথর

কোলেস্টেরল-সমৃদ্ধ পিত্ত থেকে এ ধরনের পাথর তৈরি হয়। পশ্চিমা দেশগুলোতে এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরনের পাথর।

২. পিগমেন্ট পাথর

বিলিরুবিনের সঙ্গে সম্পর্কিত এ ধরনের পাথর কিছু নির্দিষ্ট রোগে বেশি দেখা যায়। যেমন—কিছু ধরনের হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া, লিভারের রোগ বা পিত্তনালির সংক্রমণ

পাথরের গঠন ও উপাদান অঞ্চল, খাদ্যাভ্যাস এবং বিভিন্ন রোগের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।


৪. কারা বেশি ঝুঁকিতে?

পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বিভিন্ন কারণে বাড়তে পারে। যেমন—

  • নারী
  • বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে
  • অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
  • গর্ভাবস্থা
  • ইস্ট্রোজেনের প্রভাব বা কিছু হরমোনাল ওষুধ
  • পরিবারের কারও পিত্তপাথরের ইতিহাস
  • ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
  • দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
  • দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা অত্যন্ত কম-ক্যালরির ডায়েট
  • কিছু লিভারের রোগ
  • হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া
  • কিছু অন্ত্রের রোগ
  • উচ্চমাত্রার ট্রাইগ্লিসারাইড ও মেটাবলিক সিনড্রোম

নারীদের মধ্যে, বিশেষ করে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ইস্ট্রোজেনের প্রভাবে পিত্তপাথরের ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

তাহলে ‘৫F’ সূত্র কি সঠিক?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রচলিত একটি পুরোনো mnemonic হলো Female, Forty, Fertile, Fat, Fair বা ‘৫F’। এটি মনে রাখার একটি ঐতিহাসিক সূত্র হলেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগীর ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য শুধু এই ৫টি বিষয়কে নির্ভরযোগ্য সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হয় না।

বিশেষ করে ‘Fair’ বা ফর্সা ত্বককে পিত্তপাথরের ঝুঁকির কারণ হিসেবে সাধারণ পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তাই ঝুঁকি বোঝাতে স্থূলতা, বয়স, নারী হওয়া, গর্ভাবস্থা, পারিবারিক ইতিহাস, দ্রুত ওজন কমা, ডায়াবেটিস ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া বেশি যুক্তিযুক্ত।


৫. পিত্তথলির পাথরের লক্ষণ কী?

অনেকের পিত্তথলিতে পাথর থাকলেও কোনো উপসর্গ থাকে না। এসবকে বলা হয় silent gallstones বা উপসর্গহীন পিত্তপাথর।

তবে পাথর পিত্তনালির মুখে বাধা সৃষ্টি করলে ব্যথা হতে পারে।

সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—

  • পেটের ওপরের ডান দিকে ব্যথা
  • কখনো পেটের মাঝামাঝি অংশেও ব্যথা
  • ব্যথা পিঠ বা ডান কাঁধে ছড়িয়ে পড়তে পারে
  • সাধারণত হঠাৎ শুরু হয়ে কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে
  • বমি বমি ভাব বা বমি
  • বিশেষ করে ভারী বা চর্বিযুক্ত খাবারের পর ব্যথা অনুভূত হতে পারে

বদহজম, গ্যাস বা পেট ফাঁপা একা পিত্তপাথরের নির্দিষ্ট লক্ষণ নয়। এসব উপসর্গের আরও অনেক কারণ থাকতে পারে।


৬. কোন লক্ষণগুলো বিপদের সংকেত?

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি—

  • কয়েক ঘণ্টা ধরে তীব্র পেটব্যথা
  • জ্বর বা কাঁপুনি
  • বারবার বমি
  • চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া
  • গাঢ়/চা-রঙের প্রস্রাব
  • অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে মল
  • তীব্র ও ক্রমাগত পেটব্যথা

এগুলো পিত্তথলির প্রদাহ, পিত্তনালির সংক্রমণ বা পিত্তনালিতে বাধার মতো জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে।


৭. পিত্তথলির পাথর কীভাবে শনাক্ত করা হয়?

আলট্রাসনোগ্রাম

অ্যাবডোমেনের আলট্রাসনোগ্রাম (USG) সাধারণত পিত্তথলির পাথর শনাক্ত করার প্রথম এবং সবচেয়ে ব্যবহৃত পরীক্ষা। এতে পাথর, পিত্তথলির দেয়ালের পরিবর্তন এবং পিত্তনালির প্রসারণসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখা যায়।

রক্ত পরীক্ষা

প্রয়োজনে করা হতে পারে—

  • CBC
  • Liver function test (LFT)
  • Serum bilirubin
  • অন্যান্য লিভার এনজাইম

এসব পরীক্ষার মাধ্যমে সংক্রমণ, প্রদাহ বা পিত্তনালিতে বাধার সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

MRCP

MRCP (Magnetic Resonance Cholangiopancreatography) হলো MRI-ভিত্তিক একটি বিশেষ পরীক্ষা, যার মাধ্যমে পিত্তনালি ও অগ্ন্যাশয়ের নালির ছবি পাওয়া যায়। পিত্তনালিতে পাথর থাকার সন্দেহ থাকলে এটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে।

CT Scan

নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে CT scan করা হতে পারে, বিশেষ করে অন্য কোনো জটিলতা বা বিকল্প রোগের সম্ভাবনা মূল্যায়নের জন্য।

ERCP

ERCP সাধারণত শুধু পিত্তথলির পাথর শনাক্ত করার রুটিন পরীক্ষা নয়।

পিত্তনালিতে পাথর আটকে থাকলে ERCP-এর মাধ্যমে সেই পাথর অপসারণ করা সম্ভব। অর্থাৎ এটি একই সঙ্গে একটি চিকিৎসামূলক পদ্ধতি।


৮. পিত্তথলির পাথরের চিকিৎসা কী?

চিকিৎসা নির্ভর করে পাথরটি কোথায় রয়েছে, উপসর্গ আছে কি না এবং কোনো জটিলতা হয়েছে কি না—এসবের ওপর।

উপসর্গহীন পাথর

যাদের পিত্তথলিতে পাথর আছে কিন্তু কোনো উপসর্গ বা জটিলতা নেই, সাধারণত তাদের রুটিনভাবে অস্ত্রোপচার করার প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ করাই যথেষ্ট হতে পারে।

তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রম হতে পারে। তাই ব্যক্তিভেদে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।

উপসর্গযুক্ত পিত্তপাথর

বারবার ব্যথা বা পিত্তপাথরের কারণে জটিলতা হলে সাধারণত ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমি বা ল্যাপারোস্কোপির মাধ্যমে পিত্তথলি অপসারণ করা হয়। এটি symptomatic gallstone disease-এর প্রধান চিকিৎসা।


৯. ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমির সুবিধা কী?

এটি সাধারণত ছোট ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে করা হয়। এর সুবিধার মধ্যে রয়েছে—

  • তুলনামূলক ছোট ক্ষত
  • সাধারণত কম ব্যথা
  • দ্রুত স্বাভাবিক কাজে ফেরার সুযোগ
  • বড় অস্ত্রোপচারের তুলনায় দ্রুত আরোগ্য

তবে কতদিন হাসপাতালে থাকতে হবে বা পুরোপুরি সুস্থ হতে কত সময় লাগবে, তা রোগীর অবস্থা, অস্ত্রোপচারের ধরন ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে।


১০. কখন জরুরি চিকিৎসা বা দ্রুত অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে?

পিত্তপাথরের কারণে নিচের জটিলতাগুলো হলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে—

  • Acute cholecystitis — পিত্তথলির তীব্র প্রদাহ
  • Common bile duct stone — পিত্তনালিতে পাথর
  • Cholangitis — পিত্তনালির সংক্রমণ
  • Gallstone pancreatitis — পিত্তপাথরের কারণে অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ
  • পিত্তথলিতে পুঁজ বা গুরুতর সংক্রমণ
  • পিত্তনালিতে বাধা

পিত্তনালিতে পাথর থাকলে অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে ERCP-এর মাধ্যমে পাথর অপসারণ করা হয় এবং পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী পিত্তথলি অপসারণের অস্ত্রোপচার করা হয়।


১১. ওষুধ খেয়ে কি পিত্তথলির পাথর গলানো যায়?

কিছু নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে ursodeoxycholic acid (ursodiol)-এর মতো ওষুধ ছোট কোলেস্টেরল পাথর দ্রবীভূত করতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে—

  • এটি সব ধরনের পাথরের ক্ষেত্রে কাজ করে না
  • চিকিৎসায় দীর্ঘ সময় লাগতে পারে
  • পাথর সম্পূর্ণ গলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই
  • চিকিৎসা বন্ধ করার পর আবার পাথর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে

তাই উপসর্গযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত অস্ত্রোপচারের বিকল্প হিসেবে রুটিন চিকিৎসা নয়।


১২. পিত্তথলি অপসারণের পর কি স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়?

হ্যাঁ।

পিত্তথলি পিত্তরস তৈরি করে না; এটি মূলত পিত্তরস জমিয়ে রাখে। পিত্তথলি অপসারণের পর যকৃত থেকে পিত্তরস সরাসরি ক্ষুদ্রান্ত্রে যেতে থাকে।

ফলে অধিকাংশ মানুষ পিত্তথলি ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর সাময়িকভাবে পাতলা পায়খানা বা কিছু খাবারে অস্বস্তি হতে পারে, যা অনেক সময় ধীরে ধীরে কমে যায়।


১৩. চিকিৎসায় দেরি হলে কী ধরনের জটিলতা হতে পারে?

পিত্তপাথর পিত্তনালিতে বাধা সৃষ্টি করলে বা দীর্ঘ সময় চিকিৎসা না হলে কিছু ক্ষেত্রে হতে পারে—

  • পিত্তথলির তীব্র প্রদাহ
  • পিত্তথলিতে সংক্রমণ বা পুঁজ
  • পিত্তথলির দেয়ালে ক্ষতি
  • পিত্তথলি ফুটো হয়ে যাওয়া
  • পিত্তনালিতে সংক্রমণ
  • জন্ডিস
  • অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ
  • বিরল ক্ষেত্রে অন্ত্রে পাথরজনিত বাধা

তাই দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র উপসর্গকে শুধু ‘গ্যাসের সমস্যা’ ভেবে বসে থাকা উচিত নয়।


১৪. পিত্তপাথর প্রতিরোধ করা যায় কি?

পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সব কারণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে ঝুঁকি কমানোর জন্য কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস উপকারী।

যা করতে পারেন—

  • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন
  • অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ও নিরাপদভাবে ওজন কমান
  • ক্র্যাশ ডায়েট বা অত্যন্ত কম-ক্যালরির ডায়েট এড়িয়ে চলুন
  • নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করুন
  • শাকসবজি, ফল, ডাল ও পূর্ণশস্যসহ ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খান
  • অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কমান
  • অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার কমান
  • ডায়াবেটিস ও অন্যান্য বিপাকীয় রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখুন

দ্রুত ওজন কমানো পিত্তপাথরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই ওজন কমানোর ক্ষেত্রে ধীরে ও টেকসই পদ্ধতি অনুসরণ করা ভালো।

শুধু বেশি পানি পান করলেই পিত্তপাথর প্রতিরোধ করা যায়—এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। পর্যাপ্ত পানি পান অবশ্যই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস, তবে পিত্তপাথর প্রতিরোধের মূল বিষয় হলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা ও স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা।


পিত্তপাথর নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

ভুল ধারণা: পিত্তথলিতে পাথর হলেই অস্ত্রোপচার করতে হয়।

সত্য: উপসর্গহীন পিত্তপাথরের অধিকাংশ ক্ষেত্রে রুটিন অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। তবে উপসর্গ, জটিলতা বা বিশেষ ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিতে পারেন।

ভুল ধারণা: ঘরোয়া বা আয়ুর্বেদিক উপায়ে পিত্তপাথর নিশ্চিতভাবে গলে যায়।

সত্য: পাথর ‘গলিয়ে ফেলার’ দাবি করা বিভিন্ন ঘরোয়া পদ্ধতির কার্যকারিতার নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এসব পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বিলম্বিত করা ঝুঁকিপূর্ণ।

ভুল ধারণা: পিত্তথলি অপসারণ করলে সারাজীবন হজমের সমস্যা হবে।

সত্য: অধিকাংশ মানুষ পিত্তথলি অপসারণের পর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

ভুল ধারণা: পেটব্যথা হলেই বুঝতে হবে পিত্তথলিতে পাথর হয়েছে।

সত্য: পেটব্যথার অনেক কারণ রয়েছে। গ্যাস, আলসার, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহসহ বিভিন্ন রোগেও একই ধরনের ব্যথা হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি।


কখন দ্রুত হাসপাতালে যাবেন?

নিচের কোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নিন—

তীব্র বা কয়েক ঘণ্টা ধরে স্থায়ী পেটব্যথা
জ্বর বা কাঁপুনি
বারবার বমি
চোখ বা শরীর হলুদ হয়ে যাওয়া
গাঢ় রঙের প্রস্রাব
ফ্যাকাশে মল
তীব্র পেটব্যথার সঙ্গে দুর্বলতা বা অসুস্থ বোধ করা

এগুলো পিত্তথলি, পিত্তনালি বা অগ্ন্যাশয়ের গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।


শেষ কথা

পিত্তথলির পাথর একটি সাধারণ সমস্যা হলেও সব পাথরের চিকিৎসা এক রকম নয়। পাথর আছে কি না, পাথরটি কোথায়, উপসর্গ আছে কি না এবং কোনো জটিলতা হয়েছে কি না—এসবের ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে।

উপসর্গহীন পাথরের ক্ষেত্রে অনেক সময় শুধু পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট। অন্যদিকে বারবার ব্যথা, পিত্তথলির প্রদাহ বা অন্যান্য জটিলতা হলে ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমি কার্যকর ও প্রচলিত চিকিৎসা। পিত্তনালিতে পাথর থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী ERCP করে পাথর অপসারণ করা হতে পারে।

তাই পেটের ওপরের ডান দিকে বারবার বা তীব্র ব্যথা হলে নিজে নিজে ‘গ্যাসের ওষুধ’ খেয়ে সমস্যাটি উপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যাবডোমেনের আলট্রাসনোগ্রাম ও রক্ত পরীক্ষা রোগ নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপ হতে পারে।

সময়মতো রোগ নির্ণয়, সঠিক চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন—পিত্তপাথরের জটিলতা এড়ানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসার বিকল্প নয়। পিত্তথলির পাথর বা পেটব্যথার ক্ষেত্রে রোগীর উপসর্গ ও পরীক্ষার ফল অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।