অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম। পিতা আমিনুল ইসলাম। মা রহিমা খাতুন। চার ভাই-বোনের মধ্যে কামরুল ইসলাম ছিলেন দ্বিতীয়। ১৯৮০ সালে তিনি পাবনার চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং মেধা তালিকায় রাজশাহী বিভাগে ১৫তম স্থান অধিকার করেন। ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৮২ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১০ম স্থান অর্জন করেন। অধ্যাপক কামরুল ইসলাম ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৪০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। ১৯৯০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ৮টি মেডিকেল কলেজের সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন, অতঃপর স্বর্ণপদকসহ এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে এফসিপিএস, ২০০০ সালে ইউরোলজিতে এমএস এবং ২০০৩ সালে ইংল্যান্ডের রয়েল কলেজ অব সার্জনস অব এডিনবার্গ থেকে এফআরসিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। কামরুল ইসলাম ১৯৯৩ সালে বিসিএসের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন। তিনি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক হিসেবেও কর্মরত ছিলেন। ২০০৭ সালে তিনি প্রথমবারের মতো সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপনের কাজ শুরু করেন। ২০১১ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সিকেডি হাসপাতাল। ২০১৪ সালে শ্যামলীতে প্রতিষ্ঠা করেন সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতাল। অধ্যাপক কামরুল ইসলাম ৩ কন্যা সন্তানের জনক। এই মেধাবী ও জনদরদী চিকিৎসককে চিকিৎসা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য এ বছর (২০২২) স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। মানবতার ডাক্তার অধ্যাপক কামরুল ইসলাম গরীবের বন্ধু হিসেবে খ্যাত অধ্যাপক কামরুল ইসলাম সৃষ্টি করেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। এখন পর্যন্ত সহস্্রাধিক কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন কোনোরকম পারিশ্রমিক ছাড়াই। সাফল্যের হার ৯৬%। মানবসেবার মহান ব্রত থেকেই চিকিৎসাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন অধ্যাপক কামরুল ইসলাম। পেছনে ছিল মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পিতার অনুপ্রেরণা। সেই পথ ধরে নিজের পেশাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন মানুষের কল্যাণে। তিনি মনে করেন অর্থ উপার্জন করাই সফলতা নয়, বরং একজন অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করে তুলতে পারাটাই একজন চিকিৎসকের আসল সার্থকতা। ছাত্রজীবন থেকেই ভীষণ মেধাবী ছিলেন ডা. কামরুল ইসলাম। কর্মজীবনেও তার স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০১৪ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সিকেডি হাসপাতাল গরীব রোগীদের কমমূল্যে কিডনি প্রতিস্থাপন ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবায় নিবেদিত এক প্রতিষ্ঠান। হাসপাতালটির বর্তমান অবস্থান ঢাকার শ্যামলীর ৩ নম্বর সড়কে। করোনা মহামারির মধ্যেও সিকেডি হাসপাতাল তার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। মহামারির দেড় বছরে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে ২৫০টির বেশি কিডনি। কামরুল ইসলাম বলেন, কাউকে জোর করতে হয়নি, যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিষ্ঠানের সবাই নিজের ইচ্ছাতেই কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। বর্তমানে এই হাসপাতালে সপ্তাহে ৪টি করে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। যা দেশের অন্য যে কোনো হাসপাতালের তুলনায় বেশি। নির্ধারিত ন্যূনতম খরচ বাদে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য বিশেষজ্ঞ সার্জন হিসেবে কোনো ফি নেন না অধ্যাপক কামরুল। তাই তিনি হয়ে উঠেছেন অসহায় মানুষের সহায়। জানা যায়, এই হাসপাতালে ২ লাখ ১০ হাজার টাকার প্যাকেজ মূল্যে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। এই সেবায় ১৫ দিনের প্যাকেজের মধ্যে আছে ২ জনের অস্ত্রোপচার খরচ (রোগী ও ডোনার), বেড ভাড়া ও ওষুধ খরচ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর চেয়ে কম খরচে দেশের বেসরকারি কোনো হাসপাতালে কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। পাশের দেশ ভারতেও কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য খরচ হয় ১৫ লাখ টাকার বেশি। এ ছাড়া, সিকেডি হাসপাতালে আনুষঙ্গিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচও তুলনামূলক কম। কিডনি প্রতিস্থাপনের আগে ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হলে সিকেডি হাসপাতালেই তার ব্যবস্থা আছে। আছে ২২ বেডের একটি ডায়ালাইসিস ইউনিট। প্রতি ডায়ালাইসিস খরচ দেড় হাজার টাকা। আইসিইউ শয্যার খরচ ৭ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকার মধ্যে। অধ্যাপক কামরুল জানান, কিডনি প্রতিস্থাপন করা রোগীর ভালো থাকার অন্যতম শর্ত হলো ফলোআপ। প্রথম দিকে প্রতি মাসে ১ বার, পরবর্তীতে ২-৩ মাস পর পর এই ফলোআপের দরকার হয়। প্রতিদিন অনেক রোগী দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই হাসপাতালে ফলোআপের জন্য আসেন। প্রতি মাসে এখানে অন্তত ৫শ’-৬শ’ রোগী আসেন ফলোআপের জন্য। তাদের ফলোআপ বিনামূল্যে করানো হয়। তাতে রোগী প্রতি পরীক্ষার খরচ আসে ৫০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা। এমনকি রিপোর্ট দেখতে কোনো ফি নেয়া হয় না। এসব রোগীর বেশিরভাগই দরিদ্র। দেখা যায় সারারাত জার্নি করে তারা ঢাকায় আসেন। সারাদিন হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সন্ধ্যায় ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি যান। মাঝের সময়টাতে তাদের বিশ্রাম ও খাবারের ব্যবস্থা করতে পারলে ভাল হতো, কিডনি রোগীদের জন্য সেটা খুব জরুরি। কিন্তু সে সঙ্গতি আমাদের নেই, আফসোস করে বলেন ডাক্তার কামরুল ইসলাম। অধ্যাপক কামরুল ইসলাম বলেন, এই ফলোআপের কারণে রোগীর কিডনি অনেক দিন সুস্থ থাকে। যদি ফলোআপ পরীক্ষার জন্য টাকা নেয়া হতো, তাহলে রোগীদের বড় একটি অংশ ফলোআপ পরীক্ষা করতে আসতেন না। তাতে অনেকেরই কিডনি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকতো। আগামী দিনে কিডনিদাতাদের মধ্যে কিডনি রোগ দেখা দিলে তাদেরও বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়ার পরিকল্পনা আছে বলে জানান তিনি। ডা. কামরুলের বাবা আমিনুল ইসলাম ছিলেন একজন কৃষিবিদ। ছিলেন পাবনার ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্রের আরনোমিস্ট। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের হাতে নৃশংসভাবে শহীদ হন। কামরুল ইসলাম বলেন, আমার দাদার বাড়ি ঈশ্বরদী। আমাদের পরিবারের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আমি তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি। আমার এক ফুপাতো ভাই শহীদ হয়েছেন। কিন্তু কোথায় শহীদ হয়েছেন তা আমরা জানি না। আমার মা আমাদের নিয়ে তখন নানার বাড়ি চলে যান, নানা বাড়ি একই গ্রামে। আমাদের বাসায় মুক্তিযোদ্ধারা আসতেন, মিটিং করতেন। খবর পেয়ে রাজাকাররা আমার বাবাকে বাসায় এসে নির্মমভাবে হত্যা করে। এক সময় মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু আমাদের যুদ্ধটা শুরু হয়। আমার মা আমাদের সব ভাই-বোনকে মানুষ করেছেন, নিজেও পড়াশোনা করেছেন। আমার মা অধ্যাপিকা রহিমা খাতুন। তিনি খুব দৃঢ়চিত্ত মানুষ। আমার বাবা যখন মারা যান তখন আমার ছোট ভাইয়ের বয়স মাত্র ৫ দিন। আমাদের সবাইকে নিয়ে মা জীবনযুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে প্রথম হয়েছিলেন। তিনি চাইতেন ভালো রেজাল্ট। আমরাও চেষ্টা করতাম সব সময় ভালো রেজাল্ট করতে। আমাদের উদ্দেশ্য জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে হবে। আমার চাচা আমাদের সহযোগিতা করেছেন। বেশি সাপোর্ট করেছেন মামারা। তিনি বিশ্বাস করেন ছোট ছোট সাফল্যগুলোই বড় সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। মানবতার সেবায় নিবেদিত এই চিকিৎসক মনে করেন, পৃথিবী পূর্ণতা অর্জনের জায়গা নয়। সুখ দুই প্রকার। এক প্রকার সুখ রয়েছে ভোগ করার মধ্য দিয়ে। আরেক প্রকার সুখ আসে ত্যাগের মধ্য দিয়ে। ভোগের সুখ ক্ষণস্থায়ী, আর ত্যাগের সুখ চিরঞ্জীব। অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম বলেন, মানুষকে ভালোবাসতে হবে। আর ভালোবাসা থেকেই ভালো কাজ আসে। তিনি আরও বলেন, সুখের প্রধান সোপান হলো কম চাহিদা। রোগীকে সুস্থ করে তুলতে পারলেই ডাক্তারের সার্থকতা। কামরুল ইসলাম সব সময় জোর দেন সিম্বায়োটিক চ্যারিটিতে। তিনি বলেন, ‘আইসিইউতে থাকা একজন মৃত্যুপথযাত্রী পারেন আরও মানুষকে বাঁচাতে সিম্বায়োটিক চ্যারিটির মাধ্যমে। আইসিইউতে যারা মারা যান, সেই সব মৃত ব্যক্তিদের কিডনি যদি ভালো থাকে, তাহলে তা দিয়ে ২ জন রোগীকে সুস্থ করা যায়। এই ব্যাপারটাতে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি।' মানুষের কল্যাণে নিবেদিত এই চিকিৎসকের নিজের সম্পর্কে মূল্যায়ন হচ্ছে, একটা মানুষের চলার জন্য খুব বেশি পয়সা তো লাগে না। যে সম্মান আমি পেয়েছি, মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি, এটিই অমূল্য। এটি তো আর টাকা দিয়ে পাওয়া যাবে না।