সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া ওষুধের বিজ্ঞাপন, প্রমোশনাল পোস্ট ও ভিডিও প্রচার বন্ধে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ)। সম্প্রতি ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও ও পোস্টে ওষুধের ব্যবহার, কার্যকারিতা ও চিকিৎসাসংক্রান্ত দাবি ডিজিডিএর নির্দেশ লঙ্ঘন করায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এক দিন পর ১৬ জুন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বাপি) তার সদস্য কম্পানিগুলোকে স্মারক চিঠি পাঠিয়ে ডিজিডিএর নির্দেশনা মেনে চলার জন্য অনুরোধ জানায়। বাপির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) মো. মোস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও আইনি বাধ্যবাধকতা বজায় রাখতে আপনাদের সক্রিয় সহযোগিতা একান্ত কাম্য।
দেশে ওষুধের সরাসরি গণমাধ্যম বিজ্ঞাপন কার্যত নিষিদ্ধ। রোগীরা ওষুধ সম্পর্কে জানার প্রধান উৎস হিসেবে নির্ভর করে চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট অথবা অসংগঠিত ইন্টারনেট সূত্রের ওপর। খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞা কি সত্যিই জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় অপরিহার্য, নাকি রোগীর তথ্য জানার মৌলিক অধিকার খর্ব করছে, যার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হচ্ছে তাদের?
এ ব্যাপারে বায়োমেডিক্যাল গবেষক ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের (এআইইউবি) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. হুমায়রা ফেরদৌস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং ওষুধের ভুল প্রয়োগ রোধে কর্তৃপক্ষের সচেতনতা ও তৎপরতা প্রশংসনীয়। তবে একই সঙ্গে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং ভোক্তা অধিকারের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
বিজ্ঞাপনে নিষেধাজ্ঞা বনাম অনৈতিক ‘মাঠ পর্যায়ের বিপণন’ : বাংলাদেশে ১৯৮২ সালের ওষুধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ এবং ২০২৩ সালের নতুন আইনের মাধ্যমে প্রেসক্রিপশনভিত্তিক ওষুধের সরাসরি প্রচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। গণমাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ থাকায় ওষুধ কম্পানিগুলো বেছে নিয়েছে বিকল্প পথ, যাকে বলা হচ্ছে ‘আগ্রাসি মাঠ পর্যায়ের বিপণন’।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ওষুধ কম্পানিগুলো তাদের টার্নওভারের প্রায় ২৯ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে বিপণন খাতে। ২০১৮ সালের এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বাজারের মধ্যে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা শুধু বিপণনেই ব্যয় করা হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় ৭৭ শতাংশ চিকিৎসক উপহার নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অনৈতিক প্রমোশন বন্ধ করা গেলে ওষুধের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারক কম্পানির এক টেরিটরি সুপারভাইজার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওটিসি (ওভার দ্য কাউন্টার) বা প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রয়যোগ্য ওষুধের বিজ্ঞাপনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রে সচেতন হতে পারছে না। আমরা মূলত ওষুধের দোকান ও চিকিৎসকদের কাছেই পৌঁছতে পারি, কিন্তু সাধারণ মানুষ ওষুধ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ পায় না। মানুষকে সচেতন করতে ওষুধের বিজ্ঞাপন প্রক্রিয়া আরো সহজ ও উন্মুক্ত করা উচিত। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে, যা বন্ধ করে দিলে ভোক্তার তথ্য পাওয়ার পথ আরো সংকুচিত হবে।’
ওটিসি বিজ্ঞাপন ও তথ্য অধিকার : যুক্তরাষ্ট্র ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে প্রেসক্রিপশন ওষুধের সরাসরি ভোক্তা-লক্ষ্য বিজ্ঞাপন (ডিটিসিএ) অনুমোদিত হলেও বিশ্বজুড়ে মূলত ওটিসি ওষুধের বিজ্ঞাপন বহুল প্রচলিত। আমেরিকায় এফডিএর নিয়ম অনুযায়ী বিজ্ঞাপনে ওষুধের উপকারিতার পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকির একটি ‘ফেয়ার ব্যালান্স’ বা ভারসাম্যপূর্ণ তথ্য প্রদর্শন করতে হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশে ওটিসি বিজ্ঞাপনে ওষুধের মূল রাসায়নিক নাম (জেনেরিক নাম), সঠিক মাত্রা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া স্পষ্ট ফন্টে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক।
উন্নত বিশ্বে এই বিজ্ঞাপনগুলো ভোক্তাদের সচেতন করতে কতটা কার্যকর, তার একটি বড় উদাহরণ বহুজাতিক ওষুধ কম্পানি নভো নরডিস্কের সাড়া-জাগানো ক্যাম্পেইন ‘দেয়ারস অনলি ওয়ান ওজেম্পিক’। আমেরিকার বাজারে ওজন কমানোর ওষুধ হিসেবে ‘ওজেম্পিক’ নামটি পপ-কালচারের অংশ হয়ে ওঠায় মানুষ এর মূল কাজটাই ভুলতে বসেছিল। এই বিভ্রান্তি দূর করতে বিজ্ঞাপনে বিখ্যাত অভিনেতা জাস্টিন লং অভিনয় করেন মূল ‘ওজেম্পিক’ চরিত্রে, আর জন হজম্যান অভিনয় করেন বাজারে থাকা অননুমোদিত জেনেরিক বা বিকল্প ওষুধের চরিত্রে। হাস্যরসের ছলে তাঁদের কথোপকথনের মাধ্যমে দর্শকদের বোঝানো হয় যে ওজেম্পিক শুধু ওজন কমানোর কোনো ম্যাজিক পিল নয়, বরং এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ক্রনিক কিডনি রোগ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর জন্য এফডিএ স্বীকৃত একটি জরুরি ওষুধ।
বাংলাদেশেও এমন ইতিবাচক ও তথ্যবহুল বিজ্ঞাপনের রূপান্তর ঘটানো সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন একটি যুগোপযোগী ও কঠোর তদারকি নীতিমালা।
বিজ্ঞাপনে জেনেরিক নাম ও সঠিক তথ্য প্রচার করা হলে মানুষ বুঝতে পারবে তারা আসলে কোন উপাদানটি গ্রহণ করছে। এটি বাজারে একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধ করবে এবং রোগীকে সাশ্রয়ী মূল্যে বিকল্প ওষুধ বেছে নেওয়ার সুযোগ দেবে।
ওটিসি নীতিমালার সংস্কার চান বিশেষজ্ঞরা : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওষুধশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ; কিন্তু লাভের পেছনে জনস্বাস্থ্য যেন বলি না হয়। তাঁরা সুপারিশ করেন ডিজিডিএ অনুমোদিত তথ্যমূলক ক্যাম্পেইন চালু, এমআরদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা, জনসচেতনতা ক্যাম্পেইন জোরদারের।
জাতীয় ওষুধ নীতি অনুযায়ী, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ফার্মেসি থেকে সরাসরি কেনার জন্য অনুমোদিত অ্যালোপ্যাথিক ওটিসি ওষুধের সংখ্যা ৩৯। তবে ভেষজ ও অন্যান্য ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতিসহ সরকারের নির্ধারিত পূর্ণাঙ্গ তালিকায় মোট ১১০টি ওটিসি ওষুধ।
ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোও এ ক্ষেত্রে কড়াকড়ি শিথিল করে যুগোপযোগী গাইডলাইন তৈরির দাবি জানিয়েছে।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সাবেক সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশের একটি বিরাট জনগোষ্ঠী এখনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত। এই পরিস্থিতিতে যদি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ওষুধের বিজ্ঞাপন ও তথ্য প্রচারের সুযোগ দেওয়া হতো, তবে মানুষ ওষুধের ভালো-মন্দ ও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সহজে জানতে পারত।’
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইনও মনে করেন, তথ্যের অতিরিক্ত কড়াকড়িতে রোগীরা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে কনশাস কনজিউমারস সোসাইটির (সিসিএস) সভাপতি ড. আহসান হাবিব জানান, চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনে জেনেরিক নাম না লিখে ব্র্যান্ডের নাম লেখায় কম্পানিগুলো অনৈতিক লেনদেনের সুযোগ পায়। এই চক্র ভাঙতে জেনেরিক নামের প্রচার এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে বিজ্ঞাপন উন্মুক্ত করা প্রয়োজন।
ড. হুমায়রা ফেরদৌস এ বিষয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের রূপরেখা দিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রোগী কী ওষুধ খাচ্ছে, কেন খাচ্ছে এবং এর ভালো-মন্দ বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো জানার অধিকার তার অবশ্যই রয়েছে। দেশে শিক্ষার হার বাড়ায় এখন মানুষের কাছে এই বার্তাগুলো পৌঁছানো অনেক সহজ। এ ক্ষেত্রে তথ্য কমিশন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়ে জ্ঞানসম্পন্ন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের (কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট) নিয়ে তারা একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করতে পারে। এই ইউনিটটি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে তুলে ধরে কিভাবে বিজ্ঞাপন তৈরি করা যায়, তার একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন বা নীতিমালা তৈরি করবে।’
প্রশাসনের অবস্থান : এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আকতার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কম্পানিগুলো জনস্বার্থে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসহ তথ্য প্রচার করতে চাইলে অধিদপ্তরের কোনো বাধা নেই, তবে তা যেন প্রলুব্ধকরণে রূপ না নেয়।’