বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় একটি অংশই মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। এর মধ্যে ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চাপগুলোর একটি। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, আর্থ্রাইটিসসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের নিয়মিত ওষুধ কিনতে গিয়ে প্রতি মাসেই উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়।
এমন বাস্তবতায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও ওষুধের মূল্য নির্ধারণের নীতি শুধু প্রশাসনিক কোনো সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে কোটি মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সক্ষমতা। কিন্তু ২০২৬ সালের নতুন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিল করে সরকার আবারও ১৯৯৪ সালের নীতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে—তিন দশকেরও বেশি সময় আগের একটি নীতিতে ফিরে যাওয়া বর্তমান বাংলাদেশের জন্য কতটা যৌক্তিক?
এই সিদ্ধান্তে কি ওষুধের দাম কমবে, নাকি প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নতুন সংকট তৈরি হবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এর শেষ পর্যন্ত চাপটা গিয়ে পড়বে কার ওপর? সাধারণ রোগীর ওপরই কি?
এই প্রশ্নগুলো সামনে রেখেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের নীতি।
“মায়ের ডায়াবেটিস-আর্থ্রাইটিস, বাবার হৃদ্রোগসহ আরও নানা রোগ। নিয়মিত ডাক্তার দেখানো, ওষুধ কেনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা—এসবের মধ্যেই আছি। মাসে অন্তত ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়, মাঝেমধ্যে আরও বেশি।”
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মাজহারুল ইসলাম নিজের পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়ের কথা বলতে গিয়ে এভাবেই পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা ব্যয় মিটিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা তার জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, “আমার দুটি ছোট বাচ্চা আছে। তাদের পেছনেও খরচ বাড়ছে। নিয়মিত সংসার খরচ তো রয়েছেই।”
বাংলাদেশে এমনিতেই চলছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি চিকিৎসা ব্যয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে চিকিৎসা ব্যয় দিন দিন বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
এর মধ্যেই চলতি মাসে মন্ত্রিসভা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তৈরি করা ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬’ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকারের যুক্তি হলো, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এবং জাতীয় ড্রাগ অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের পরামর্শ ছাড়াই ওই তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছিল। পাশাপাশি এ নিয়ে হাইকোর্টে রিটও হয়েছে। এ কারণে সরকার ১৯৯৪ সালের পুরোনো নীতিতে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হলো এমন কিছু জীবনরক্ষাকারী ও গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের নির্দেশিকা, যা একটি দেশের মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার প্রধান চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হয়।
সাধারণত এ তালিকায় ব্যথা ও জ্বরনাশক, অ্যান্টিবায়োটিক ও সংক্রমণরোধী ওষুধ, হৃদ্রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ, পেটের রোগের ওষুধ, মৃগী ও স্নায়ুরোগের ওষুধ, অ্যানেস্থেসিয়া ও অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত ওষুধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৭৭ সাল থেকে Model List of Essential Medicines প্রকাশ করে আসছে এবং সাধারণত প্রতি দুই বছর পরপর তা হালনাগাদ করা হয়।
এর মূল উদ্দেশ্য হলো—প্রয়োজনীয় ওষুধগুলো যেন নিরাপদ, কার্যকর, মানসম্মত, সহজলভ্য এবং মানুষের সাধ্যের মধ্যে থাকে, তা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে।
১৯৯৪ থেকে ২০১৬, এরপর ২০২৫
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের নীতিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় ছিল ১১৭টি ওষুধ। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের নীতিতে তা বাড়িয়ে ২৮৫টি করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তালিকাটি আরও সম্প্রসারণ করে ২৯৫টি করা হয়।
এখন ২০১৬ ও ২০২৫ সালের তালিকা বাতিল করে ১৯৯৪ সালের নীতিতে ফিরে যাওয়ায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর ফলে তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রয়োজনীয় ওষুধের ক্ষেত্রে সরকারের মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও কমে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর।
বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ—যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, আর্থ্রাইটিসসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগীরাই বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন।
৩২ বছর আগের নীতিতে ফেরা কি যৌক্তিক?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, ১৯৯৪ সালের নীতিতে ফিরে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, “ওষুধের তালিকা আরও বাড়ানোর দাবি ছিল। যেটুকু বাড়ানো হয়েছিল, সেখান থেকেও একেবারে ১৯৯৪ সালের নিয়মে চলে যাওয়া অবাস্তব।”
তার যুক্তি হলো, ১৯৯৪ সালে ব্যবহৃত অনেক ওষুধ বর্তমানে আর ব্যবহৃত হয় না। কিছু ওষুধ কার্যকারিতা হারিয়েছে বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে সেগুলোর বিকল্প এসেছে। আবার অনেক ওষুধের উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নতির কারণে উৎপাদন খরচও কমেছে।
তাই পুরোপুরি পুরোনো নীতিতে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি সংশোধন ও আধুনিকায়ন করা যেত বলে মনে করেন তিনি।
চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই রোগীর পকেট থেকে
বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই রোগীদের নিজেদের বহন করতে হয়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, দেশের দরিদ্রতম পরিবারগুলো তাদের আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করে।
সংসদে দেওয়া তথ্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত জানিয়েছিলেন, দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়। তুলনায় থাইল্যান্ডে এ হার প্রায় ১০ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮ শতাংশ।
এ অবস্থায় ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ অনেক রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই যায় ওষুধ কেনায়।
সরকারের বক্তব্য কী?
গত ৩ আগস্ট সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তালিকা প্রকাশের সময় সেই পরামর্শ নেয়নি।
এ ছাড়া নতুন তালিকার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ ইউনানি মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন এবং পরে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি হাইকোর্টে রিট করে।
সরকারের দাবি, তারা জনগণের জন্য নিরাপদ, কার্যকর ও সাশ্রয়ী মূল্যের ওষুধ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা হবে বলেও জানিয়েছে সরকার।
সরকার আরও বলছে, ওষুধের মূল্য এমনভাবে নির্ধারণ করা হবে যাতে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হয় এবং বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় থাকে।
২০২৫ সালের নীতিতে কী ছিল?
২০২৫ সালের ২৪ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের জাতীয় তালিকা প্রণয়ন ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ১৮ সদস্যের একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। পরে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের জন্য আট সদস্যের একটি উপকমিটি গঠন করা হয়।
টাস্কফোর্স ও উপকমিটি ওষুধ বিশেষজ্ঞ, ওষুধশিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তি, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ তৈরি করে। এরপর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় নতুন ওষুধ যুক্ত করে সংখ্যা ২৯৫টি করা হয়। এসব ওষুধের মূল্য সরকার নির্ধারণ করবে বলে তখন জানানো হয়েছিল।
সরকারের পক্ষ থেকে সে সময় বলা হয়েছিল, দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় একটি অংশ ওষুধ কেনার পেছনে চলে যায়। তাই ওষুধের দাম যেন চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এবং মানুষের ওপর ব্যয়ের চাপ কমে—সেই লক্ষ্যেই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তবে ওষুধশিল্পের প্রতিনিধিরা শুরু থেকেই নতুন মূল্য নির্ধারণ কাঠামোর বিরোধিতা করে আসছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। এ নিয়ে আদালতেও একাধিক রিট করা হয়।
সামনে কী করা উচিত?
বাংলাদেশের বাস্তবতায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা শুধু একটি প্রশাসনিক তালিকা নয়; এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। একদিকে সরকারকে আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। অন্যদিকে তালিকাটি এমন হতে হবে, যাতে বর্তমান সময়ের রোগের ধরন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং মানুষের বাস্তব প্রয়োজন প্রতিফলিত হয়।
তাই ১৯৯৪ সালের তালিকায় সরাসরি ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে আইনি প্রক্রিয়া মেনে একটি আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ও নিয়মিত হালনাগাদ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরি করা অধিক কার্যকর হতে পারে।
একই সঙ্গে ওষুধের মূল্য নির্ধারণে সরকার, ওষুধশিল্প, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে ভোক্তা বা রোগীদের স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
কারণ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো—অসুস্থতার কারণে যেন কোনো পরিবার আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত না হয়।
বাংলাদেশে যেখানে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় একটি অংশই রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়, সেখানে ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের যেকোনো সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত মানদণ্ড হওয়া উচিত একটি প্রশ্ন: “এই সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমবে, নাকি আরও বাড়বে?”
এই প্রশ্নের উত্তরই হওয়া উচিত বাংলাদেশের ওষুধনীতি নির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা।